সরকারের শেষ সময়ে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির দুর্নীতি-অনিয়মের প্রতিবেদন । আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলে পরবর্তী সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির যে ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে তা ওই চুক্তি বাতিলের জন্য যথেষ্ট বলে জানিয়েছে চুক্তি পর্যালোচনা সংক্রান্ত কমিটি।
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির যে ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে তা ওই চুক্তি বাতিলের জন্য যথেষ্ট বলে জানিয়েছে চুক্তি পর্যালোচনা সংক্রান্ত কমিটি। এ চুক্তি বাতিলে সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা। তবে এমন সময় এ প্রতিবেদন জমা ও সুপারিশ করা হলো যখন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ একেবারে শেষ পর্যায়ে। ফলে পর্যাপ্ত সময় না থাকায় আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলে পরবর্তী সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
কমিটির প্রধান হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। মামলার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেহেতু বর্তমান সরকারের সময় কম, আমরা চাইব পরবর্তী সরকার যেন এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেয়।’ বিলম্ব করলে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কমিটি।
গতকাল বিদ্যুৎ ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে পর্যালোচনা কমিটি। এতে আদানির চুক্তিসহ দেশের বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন কমিটির সদস্যরা। এর আগে ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। এ কমিটি দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে।
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে চুক্তির একপেশে শর্ত, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, শুল্কফাঁকিসহ নানা বিষয়ে অসংগতির অভিযোগ ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদানির বকেয়া নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার আদানিসহ বিশেষ আইনের অধীনে সম্পাদিত চুক্তি খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে।
অভিযোগ রয়েছে, আদানির চুক্তির মধ্যেই সরকার ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানিটির থেকে বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ ক্রয় শুরু করে। একই সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়ার সিংহভাগ পরিশোধ করে দেয়। কয়লার দাম নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও আদানির বড় ধরনের মতবিরোধের মধ্যে বিপুল দেনা পরিশোধের বিষয়টি নিয়েও জোরালো সমালোচনা ওঠে। এমনকি আদানির রাজস্ব ফাঁকি, চুক্তিতে দুর্নীতি-অনিয়ম তদন্তসহ নানা প্রসঙ্গও সামনে আসে।
গতকাল সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্যরা জানান, আদানির চুক্তির নেপথ্যে সাত-আটজন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। তবে আদানি পাওয়ার বলছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন বা এ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ তাদের সঙ্গে করা হয়নি। বিদ্যুৎ ভবনে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির সংবাদ সম্মেলনের পরপরই আদানি পাওয়ার সংবাদ মাধ্যমে এক বিজ্ঞপ্তি পাঠায়।
আদানির চুক্তির বিষয়ে পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান জানান, চুক্তিতে যে ধরনের দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে, আন্তর্জাতিক মামলার ক্ষেত্রে এমন শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া বিরল। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, চুক্তির বিনিময়ে কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ প্রামাণ্য তথ্য দুদককে দেয়া হয়েছে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত হিসাবে লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ‘সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে বিদ্যুৎ কিনেছে চুক্তির সময় তার চেয়ে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেয়া হয়েছে। এমনকি ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সঙ্গে তুলনা করলেও এর দাম অনেক বেশি। আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল প্রতি ইউনিট ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে। তবে শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট। এতে বছরে ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার বেশি বিল দিতে হচ্ছে আদানিকে। চুক্তি অব্যাহত থাকলে ২৫ বছর ধরে তা দিয়ে যেতে হবে।’
অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান আরো বলেন, ‘আদানি নিয়ে দেশের জনগণের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তাদের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আমাদের কমিটিকে একটা রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছিল। আমরা সেই রিপোর্ট দিয়েছি। আমরা আদালতকে একটা রিপোর্ট দিয়েছি। আদানিকে আমরা প্রতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার দিচ্ছি। আগামী ২৫ বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে। এটা একটা রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি। এ চুক্তির আওতায় আমরা ৪০ শতাংশ বেশি অর্থ পরিশোধ করছি। আগামী ২৫ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার বেশি দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘মামলায় গেলে তারা (আদানি) বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। এতে দেশে লোডশেডিং হতে পারে। দেশের জনগণকে এজন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমি প্রয়োজনে লোডশেডিং মেনে নেব, কিন্তু এ দুর্নীতি মানব না।’
দেশের বিদ্যুৎ খাতকে কীভাবে দায়-দেনায় জর্জরিত এবং সক্ষমতাকে অকার্যকর করা হয়েছে তা তুলে ধরেন কমিটির আরেক সদস্য বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘অর্থবছর ২০১১ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) পরিশোধিত অর্থ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। বিপিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতায় উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সিস্টেমের ব্যবহারের হার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ। কমিটি হিসাব করেছে, অতিরিক্ত বা অকার্যকর সক্ষমতার বার্ষিক আর্থিক ব্যয় প্রায় ৯০০ মিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে দেউলিয়া হওয়ার পথে রয়েছে বিপিডিবি।’
তিনি বলেন, ‘ঘাটতি ঠেকাতে গেলে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর তা হলে সেটি ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। এতে ওইসব দেশের শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বাংলাদেশের শিল্প।’
বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশ সাবেক সিওও আলী আশরাফ প্রমুখ।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়াতে পূর্ববর্তী সরকারের করা এ খাতের বিশেষ আইন বাতিল করে। সেই সঙ্গে বিদ্যুতের ট্যারিফ নেগোসিয়েশন ও সিস্টেম লস কমানোর উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিপিডিবির লোকসান কমানো, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ কমানোসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু দেখা যায় বিদ্যুৎ বিভাগের নেয়া এসব উদ্যোগ কোনোভাবেই এ খাতের আর্থিক চাপ কমাতে পারেনি। বরং বেসরকারি খাত থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ ক্রয় করা হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ ক্রয়সংক্রান্ত ব্যয় হয় ১ লাখ ২১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। যার মধ্যে বেসরকারি খাত (আইপিপি) থেকে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকার বিদ্যুৎ ক্রয় করা হয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের চেয়ে যা ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় ৫৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার।

