বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সন্দেহভাজন বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে (১৯) ফের তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম এ আদেশ দেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দিশাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন।
এদিন বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পুলিশি পাহারায় দিশাকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দেয়। অন্যদিকে আসামিপক্ষ রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে বলেন, তাহসিফের সাহসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ধারণের বিষয়টিও রয়েছে। ওই ভিডিও ধারণ না করা হলে শেখ হাসিনা কীভাবে দেশ ছেড়েছিলেন, তা অনেকের অজানা থেকে যেত।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, তাহসিফের সঙ্গে দিশার বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকলেও হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত নয়। তাদের দাবি, রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে দেখা করা এবং সিসিটিভি ফুটেজ ছাড়া আসামির বিরুদ্ধে অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। দিশা নারী, শিক্ষার্থী ও অসুস্থ হওয়ায় তার জামিন আবেদন করেন আইনজীবীরা।
তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেন, গত ১ নভেম্বর আদালতের নির্দেশে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই সময় তিনি জানান, ঘটনার আগে ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন। একই দিন সন্ধ্যায় উত্তরার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসেও একাধিকবার খাবার খেয়েছিলেন। এ ছাড়া তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেলের গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
তদন্ত আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে দিশা মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন এবং কিছু বিষয়ে নীরব থেকেছেন।
এদিকে মামলার আরেক সন্দেহভাজন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপও পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তার মতে, দিশা ও দীপের দেওয়া তথ্যের মধ্যে মিল-অমিল যাচাই করতে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনায় দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়,ঘটনার দিন উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ও সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসে তাহসিফের সঙ্গে দিশার কোনো বিরোধ বা বাকবিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের সম্পর্কের মধ্যে ঘটনার আগে কোনো টানাপোড়েন ছিল কি না, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, সম্ভাব্য অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং আলামত উদ্ধারের বিষয়েও তদন্ত চলছে।
পাশাপাশি দিশা ও দীপের বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের স্থান ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য নিশ্চিত করতে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে গত ৩১ অক্টোবর রাত ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই মামলায় শাহরিয়ার রেজা দীপকে প্রথমে চার দিন এবং পরে আরও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও উত্তরা এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে তাহসিফের চলাফেরার বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ২৭ অক্টোবর রাতে তিনি উত্তরা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যান। পরদিন ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসে দিশা ও দীপসহ অন্যদের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। ফুটেজে তাদের বিভিন্ন স্থানে চলাচল ও মোটরসাইকেলে ঘোরাঘুরির দৃশ্যও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরদিন তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ৩০ অক্টোবর রাত ১টা ৫ মিনিটে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

