অপরিকল্পিত ভবন, কারখানা ও গুদামসহ দায়িত্বহীনতা এবং সমন্বয়ের অভাবে দূর্ঘটনার আশংকা
আরিফ খানঃ
ঢাকার কেরানীগঞ্জ ঘণ বসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিল্প উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে অপরিকল্পিত কারখানা, তদারকির অভাব এবং নিরাপত্তার চরম অবহেলার কারণে এটি এখন ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন প্লাস্টিক কারখানা, কেমিক্যাল গুদাম, মার্কেট ও গ্যাস সিলিন্ডার বা লাইটার তৈরির কারখানায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো বারবার জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করেছে এবং বহু তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। অসেচতনতা ও দায়িত্বহীনতাই এর পিছনে মূল দায়ী বলে জানা যায়।
দূর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কেরাণীঞ্জের মতো জনবহুল এই উপজেলায় মাত্র দুই জন ফায়ার সার্ভিস ইন্সপেক্টর রয়েছেন। তারা বিভিন্ন স্থাপনায় সতর্ক নোটিশ কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেয়ার বিষয়টি দেখেন। কিন্তু বিভিন্নজনের মতে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য কোনো ভালো ফলাফল আনছে না। ভবনসহ স্থাপনার মালিকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন না কিংবা অন্যপন্থা অবলম্বন করছেন বলে যানা যায়।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, “ভবন মালিকদের নিয়ে স্থানীয় সরকার এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক আয়োজন প্রয়োজন। দীর্ঘ মেয়াদে, স্টেপ বাই স্টেপ পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করতে হবে। অগ্নিকান্ড রোধে এবং কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষনিক ব্যাবস্থা নেয়ার বিষয়ে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, “শীতের শুষ্কতা, কয়েলের অধিক ব্যাবহার, ঘরে আবদ্ধ থাকাসহ নানান কারণে শীতকালে অগ্নিকান্ড রোধে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। আমরা নিয়মিত মহড়া, সাধারণ মানুষদের মাঝে প্রশিক্ষণসহ অগ্নিকান্ড রোধে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছি।”
সাম্প্রতিক গত ২৬ অক্টোবর অগ্নিকান্ডের ঘটনাটি ঘটে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার কালিন্দী ইউনিয়নের নারিকেলবাগ এলাকায়। একটি বহুতল ভবনে অবস্থিত আমান প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লেগে সাকিব হাসান (১৮) নামের এক তরুণ শ্রমিক নিহত হন। দাহ্য কেমিক্যাল ও প্লাস্টিকপণ্যের উপস্থিতির কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিটকে প্রায় দুই ঘণ্টা লড়াই করতে হয়। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর দগ্ধ হন।
এর বাইরেও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়—বিশেষ করে জিনজিরা, কালিন্দী, ও আগানগর এলাকার অলিগলিতে গড়ে ওঠা ছোট প্লাস্টিক কারখানা, সুতা ও কেমিক্যালের গুদামে প্রায়শই শর্টসার্কিট বা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে, যা অনেক সময় বড় আকার ধারণ করার আগেই স্থানীয়দের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণে আসে।
অগ্নিকান্ডের ঘটনার সময় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ফায়ার সার্ভিসকে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পরতে হয় যাতায়াত নিয়ে। অপরিকল্পিত স্থাপনা, সরু রাস্তা—ঘাট, মানুষজনের অসহযোগীতামূলক জটলাসহ বেশ কিছু কারণে তুলনামূলক বেশী ক্ষতি হয়ে যায়।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা ইউএনও মোঃ ওমর ফারুক জানান, প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের জন্য উপজেলার অনুমোদনের নিয়ম করা হয়। ফায়ার রেসকিউ ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য সকল ব্যাবস্থাপনা ঠিক থাকলেই কেবল ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে সম্ভব না হওয়ায় বিষয়টি ইউনিয়ন প্রশাসকদের দেখার জন্য বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে কেরাণীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যাবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতি লিঃ এর সভাপতি হাজী আনোয়ার হোসেন বলেন— কেরাণীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীতে নতুন মার্কেট করার তেমন জায়গা না থাকায় অনেকেই উর্ধমূখী সম্প্রসারণ করছেন। তবে কোনোরকম নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করা হচ্ছে না। দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।
হাজী আনোয়ার আরো বলেন, আমরা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পাই না। শুধু আগুন লাগলেই কেবল ওনাদের দেখা মেলে। নিয়মিত তদারকি, মহড়া, প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা দরকার, কিন্তু হচ্ছে না। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী সংলগ্ন এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের সাব—স্টেশন স্থাপনের দাবী জানান তিনি। এছাড়াও তিনি প্রশাসন কতৃর্ক ট্রেড লাইসেন্স এর ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ ছাড়া অযথা হয়রানী ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করেন।
এদিকে বিগত বছরগুলোর বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বিশ্লেষণ করে কেরানীগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণসমূহ হিসেবে যেগুলো চিহ্নিত হয়েছে:
আবাসিক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা: ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার বহুতল ভবন বা সংকীর্ণ গলির ভেতরে প্লাস্টিক, কেমিক্যাল ও গ্যাস লাইটার তৈরির মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা গড়ে তোলা।
অগ্নি নিরাপত্তার ব্যাপক ঘাটতি: অধিকাংশ কারখানায় ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র বা লাইসেন্স থাকে না। এছাড়া পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ঋরৎব ঊীঃরহমঁরংযবৎ), স্মোক ডিটেক্টর এবং পানির রিজার্ভের ঘাটতি থাকে।
জরুরি নির্গমনের অভাব (ঊসবৎমবহপু ঊীরঃ):
বহুতল বা শেডভিত্তিক কারখানাগুলোতে সাধারণত একটিমাত্র ছোট দরজাকে আসা—যাওয়ার পথ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে আগুন লাগলে শ্রমিকরা দ্রুত বের হতে পারেন না।
দাহ্য পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত মজুদ:
কারখানায় থিনার, তারপিন, কেমিক্যাল এবং গ্যাস সিলিন্ডার কোনো ধরনের নিরাপত্তা বিধি না মেনে স্তূপ করে রাখা হয়।
আইনের প্রয়োগে শিথিলতা:
অতীতে বড় বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও পরবর্তীতে তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ায় অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে স্থায়ী কোনো আইনি পদক্ষেপ বা উচ্ছেদ কার্যক্রম টেকসই হয়নি।
দুর্ঘটনা রোধে করণীয় ও প্রতিকার
কেরানীগঞ্জের সাধারণ শ্রমিকদের জীবন রক্ষা এবং এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
কারখানাগুলো শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর: আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সব ধরনের প্লাস্টিক, কেমিক্যাল ও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা অবিলম্বে নিরাপদ ও নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে (যেমন: বিসিক শিল্পনগরী) স্থানান্তর করতে হবে।
নিয়মিত ও কঠোর মনিটরিং: জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে।
ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা:
প্রতিটি ছোট—বড় কারখানার জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা এবং তা নবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ:
কারখানায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক মহড়া এবং শ্রমিকদের প্রাথমিক উদ্ধার প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। ভবনগুলোতে একাধিক প্রশস্ত সিঁড়ি বা জরুরি নির্গমন পথ রাখা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ:
নিরাপত্তা আইন অমান্যকারী কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে কোনো মালিক শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পান।
কেরানীগঞ্জের অর্থনীতিতে প্লাস্টিক, পোশাক ও কুটির শিল্পের ভূমিকা থাকলেও শ্রমিকদের জীবনের বিনিময়ে কোনো শিল্প গড়ে উঠতে পারে না। তাই প্রশাসন ও মালিকপক্ষ উভয়ের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কেবল এই অগ্নিকাণ্ডের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

