ঢাকা-৩ আসনে বিএনপির ‘ট্রাম্প কার্ড’ কে — গয়েশ্বর, আমান না পল?

কেরানীগঞ্জ

আগামী ফেব্রুয়ারীতে হতে পারে  ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিমধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের ন্যায়, ঢাকা জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকা কেরানীগঞ্জে শুরু হয়ে গেছে আগাম প্রস্তুতি ও জল্পনা-কল্পনা। এই অঞ্চলের দুটি আসন—ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩—ঘিরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রাপ্তদের নিয়ে গুঞ্জনের শেষ নেই।

বিশেষ করে ঢাকা-৩ আসন, যেটি মূলত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন আগানগর, জিনজিরা,শুভাঢ্যা,কোন্ডা এবং তেঘরিয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত, সেখানে মনোনয়ন কে পাবেন তা নিয়ে চলছে দলীয় ও গণমাধ্যম পর্যায়ে নানা আলোচনা। দক্ষিন কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীরা ঢাকা-৩ আসন থেকে বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে তাদের এমপি হিসেবে দেখতে  চান। তবে  স্থানীয়রা বলছেন গনুঅভুথ্যানের পর গত প্রায় এক বছরে গয়েশ্বর পন্থি বিএনপি নেতাকর্মীদের অনিয়মের কারনে ভোট যুদ্ধে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন এই জাতীয় নেতা।   বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পাশাপাশি ঢাকা-৩ আসনের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন আমান উল্লাহ আমান ও রেজাউল কবির পলের নামও।

 

ঢাকা-৩ আসনের অন্তর্গত এলাকাগুলো ঘুড়ে দেখা যায়, আগামী নির্বাচনকে টার্গেট করে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে  ঢাকা ৩ আসনের প্রার্থী ঘোষনা করে প্রচার প্রচারনা শুরু করেছে।  ইতিমধ্যেই স্থানীয় নেতা কর্মীরা উঠান বৈঠক সহ সভা সমাবেশ করছে।  ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নির্বাচনী বার্তা পৌছে দিচ্ছে নেতা কর্মীরা।  তবে এই এলাকায় আমান উল্লাহ ও রেজাউল কবির পলের ও রয়েছে কর্মী সমর্থক।  তারা ব্যাপক আকারে প্রচার প্রচরনা না করলেও ছোট পরিসরে প্রচার প্রচারনা করে যাচ্ছে এবং দ্রুত সময়ে ব্যাপাক আকারে কিভাবে প্রচার প্রচারনা করা যায় তার পরিকল্পনা করছে।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বহুদিন ধরে কেরানীগঞ্জের রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি এলাকায় পরিচিত মুখ, যিনি মাঠের রাজনীতিতে যেমন সক্রিয়, তেমনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও প্রতিষ্ঠিত। স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাকে “মাঠের নেতা” হিসেবেই চেনেন। তার ঘনিষ্ঠরা মনে করেন, রাজনৈতিক ইমেজ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম—দুই দিক থেকেই তিনি এগিয়ে রয়েছেন। দক্ষিন কেরানীগঞ্জ থানা একাধিক হেবি ওয়েট বিএনপি নেতার সাথে কথা হলে কেরানীগঞ্জের আলোকে তারা জানান, দল যখন খারাপ অবস্থানে ছিলো , তখন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তাদেরকে সংগঠিত করেছেন।  সকলের খোজ খবর রেখেছে।  হামলা মামলার ঝুকি নিয়ে কেরানীগঞ্জে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছে।  এছাড়া গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির জন্য অনেক বেশি ত্যাগ শিকার করেছেন, ঢাকা ৩ আসনে গয়েশ্বর রায়কে ছাড়া অন্য কিছু ভাবার সুযোগ কোন ভাবে নেই।

এদিকে ঢাকা-২ আসনে আলোচনায় রয়েছেন ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি, এবং কর্নেল মোহাম্মদ আব্দুল  হক।  এরমধ্যে অমি ২০১৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। তাকে ঘিরে কাজ করছেন তার বাবা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান। তবে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে, আমান নিজেও ঢাকা-৩ আসনে অংশ নিতে পারেন। আমান উল্লার অনুসারীরা দাবী করছেন, নির্বাচনের আগে কেরনীগঞ্জে একটি সংসদীয় আসন ঘোষনা করবে নির্বাচন কমিশন।  তারা বলছে কেরানীগঞ্জে একটি আসন হলে আমান উল্লার বিকল্প কেও নেই।  কেরানীগঞ্জ যখন একটি সংসদীয় আসন ছিলো, তখন আমান উল্লাহ ছিলো কেরানীগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমপি।  আমান ভক্তদের দাবী, কেরানীগঞ্জ বিএনপি ও আমান উল্লাহ এক সুতোয় গাথা।  এ কারনে কেরানীগঞ্জ থেকে আমান উল্লার কোন বিকল্প নেই।  তারা আরো বলছে, যদি কেরানীগঞ্জে একটি সংসদীয় আসন নাও হয়, সেই ক্ষেত্রে ঢাকা ২ আসন থেকে আমান পুত্র ইরফান ইবনে আমান অমি এবং ঢাকা ৩ আসন থেকে আমান উল্লাহ আমান নির্বাচন করবে।

 

অপরদিকে  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল কবীর পলও চাইছে ঢাকা ৩ আসন থেকে নমিনেশন। তরুণ ও সাহসী এই নেতা গত কয়েক বছর ধরে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। এখন তিনি চান এলাকার মানুষের সরাসরি প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতে। কেরানীগঞ্জে তরুন বিএনপি সমর্থকদের মাঝেও রেজাউ্ল কবির পল কে নিয়ে উদ্দাম উদ্দীপনা তৈরী হয়েছে।  পলের পক্ষের সমর্থকরা বলছে, দেশে এখন তরুনদের গন জোয়াড় বইছে।  তারা দাবী করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বার বার বলছে আগামী নির্বাচনে ক্লিন ইমেজের ও তরুনদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।  তারেক রহমানের ঘোষনার প্রেক্ষিতে রেজাউল কবির পল কে নিয়ে স্বপ্ন বুনছেন তারা।

 

কেরানীগঞ্জের দুইটি আসনই ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে গত কয়েকটি নির্বাচনে দল সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বাধার কারণে কার্যকর উপস্থিতি রাখতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের উৎসাহ।  ঢাকা ৩ আসনের ভোটার ও স্থানীয় জনগনরা বলছেন, দীর্ঘদিন পরে তারা ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারবেন।  বিএনপি যাকেই মনোনয়ন দেক,  আগামী নির্বাচন যেহুতু সুস্ঠ ভাবে হবে, সেই ক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে বিএনপিকে অবশ্যই সতকর্তা অবল্বন করতে হবে। অন্যথায় বিএনপির ঘাটি বলে খ্যাত ঢাকা ৩ আসনটি হারাতে হতে পারে বিএনপির।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিপন আহমেদ বলেন, “এখন তো আর সেই ২০১৮ সাল না। এবার ভোট হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই এমন প্রার্থী যিনি আমাদের কথা সংসদে বলবেন, এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন।”

একইভাবে আবু তাহের নামে এক ভোটার  বলেন, “শুধু দল নয়, আমরা দেখতে চাই প্রার্থীর মানুষজনের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন। যাকে জনগণ চায়, তাকেই দল থেকে মনোনয়ন দেয়া উচিত।”

বিএনপির অভ্যন্তরে কে কার পক্ষে কাজ করছেন, কে কাকে ঠেকাতে চান—এ বিষয়েও নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, দলের মধ্যে গোপন কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ জটিলতা মনোনয়ন নির্ধারণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই সাথে গত বছর ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময় থকে এখন পর্যন্ত বিএনপির বিভিন্ন নেতার বিভিন্ন স্থানে চাদাবাজি ,দখলবাজি সহ বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা কিছুটা হলেও বিএনপিকে ভোটের লড়াইয়ে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।

কেরানীগঞ্জের রাজনীতির মাঠ এখন গরম হলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগবে। বিএনপি এখনো মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু করেনি। তবে নেতারা যার যার অবস্থান থেকে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. হুমায়ুন কবির বলেন, “কেরানীগঞ্জে ভোটাররা সচেতন। তারা দল নয়, কাজ ও নেতৃত্বের মান বিচার করে ভোট দিতে প্রস্তুত। এবারের নির্বাচন হবে অনেকটাই নতুন করে ভাবার সুযোগ।”

 

 কি বলছে গয়েশ্বর আমান পল ??

আগামী নির্বাচন নিয়ে কেরানীগঞ্জের আলোর সাথে কথা হয় বিএনপির এই তিন নেতার সাথে।

আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সাথে কথা হলে কেরানীগঞ্জের আলো কে তিনি জানান, “কেরানীগঞ্জে কে নমিনেশন পেলো আর কে পেলো না, সে চিন্তা আমার নয়। আমি কাজ করছি কেরানীগঞ্জসহ সারা দেশে বিএনপি কীভাবে আগামী নির্বাচনে ভালো ফল করতে পারে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে।  কেরানীগঞ্জের রাজনীতিতে এবং কেরানীগঞ্জের জনগনের জন্য আমি যে পরিমান কাজ করেছি, ত্যাগ শিকার করেছি, কেও করেছে বলে আমার মনে হয় না।   “আমি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কেউ যদি আমার বিরুদ্ধে কাজ করে, তাতে লাভ হবে না। জনগণই সব বুঝে। আমি এক জীবনে যা করেছি, তা জনগণের চোখের সামনে।” তবে যাই হোক নমিনেশন  নিয়ে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।‘’

অন্য দিকে আমান উল্লাহ আমানের সাথে কথা হলে, ঢাকা দুই আসনে তিনি তার ছেলে ব্যারিষ্টার ইরফান ইবনে আমান অমি বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থীরা নিশ্চিত করেন। তবে ঢাকা ৩ আসন নিয়ে আমান পন্থীদের উচ্ছাস থাকলেও তার নির্বাচন করা নিয়ে এই মুহুর্তে তিনি কোন মন্তব্য করতে চান নি।

তরুন নেতা পল জানান, “আমি রাজনীতির বাইরে থেকে আসিনি। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই পথ পাড়ি দিয়েছি। এবার ভোটের মাধ্যমে যদি জনগণ সুযোগ দেয়, তাহলে আমি এলাকাবাসীর জন্য কাজ করতে চাই।” অতি শীঘ্রই আমি ঢাকা ৩ আসনে প্রচার প্রচারনায় নামবো। 

 

শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন ঢাকা ৩ আসনে বিএনপির ট্রাম্প কার্ড তা জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে বিএনপির প্রার্থী ঘোষনা পর্যন্ত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট –  কেরানীগঞ্জের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, তারা চায় এমন কেও এখানকার এমপি নির্বাচন হোক যারা গনমানুষের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে সংসদে।