ব্যাটম্যান বনাম বাংলাদেশ ; চলচিত্র ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

গনমাধ্যম সম্পাদকীয়

মাহমুদ বিন জুনায়েদ :

আমি চলচিত্র প্রিয় মানুষ। চলচিত্রের ও রাজনীতির মধ্যে মিল খুজে বেড়াই। চলচিত্রে যেমন রাজনৈতিক ইতিহাস থাকে, তেমনি রাজনীতিতেও থাকে নাটকের আভাস। চলচিত্র ও রাজনীতি সম্পর্কে যেন ভাই-ভাই। চলচিত্রে যেমন অভিনয় থাকে, রাজনৈতিক নেতাদের বাক্যবানেও থাকে চরম নাটকীয়তা। এই নাটকীয়তার ছলে কিছু উত্তর খুজে বের করাই হবে আজকের প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের চলচিত্র ইদানিং ঢেউ তুলেছে বক্স অফিসে, আর দেশ দুলছে বিনা ছন্দে নাটকীয়তার উচ্ছাসে। দেশের চলচিত্র শিল্পে নায়কের আবির্ভাব তুলনামূলকভাবে তুচ্ছ হলেও রাজনৈতিক ময়দানে কে যে কর্মী আর কে নেতা সেটা এক বিরাট ধাধা। তারুন্যের উচ্ছাসে সবার স্বপ্ন আকাশ সমান, তাই সবাই আজ অঘোষিত সীমিত সময়ের নেতা। কার মেয়াদ যে কত ঘন্টা সেটা অনুমান কষ্টসাধ্য। পলাতকদের অভাব পূরণে পুরো দেশ যেন নেতার ফ্যাক্টরীতে পরিণত হয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে সেই ফ্যাক্টরি থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বিশেষ ঘোষনা ও নির্দেশনা। জনগন পড়ে গিয়েছে বিপদে, কোন কথা যে বিশ্বাসযোগ্য সেটা মেধা বা সোশাল মিডিয়ার লাইক, কমেন্ট বা ভিউ দিয়ে বিচার করা দুরুহ হয়ে পড়েছে। তাই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া জনগনের উপায় নাই।

বর্তমানের এই পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে গিয়ে একটি সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল। পরিচিত সেই সিনেমাটির নাম “ব্যাটম্যান”। সেখানে ব্যাটম্যান তার মেধা ও কৌশল ব্যবহার করে পুরো শহরকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু খল চরিত্রের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী গোটা শহরকে দখলে নেওয়ার জন্য অত্যন্ত কৌশলী ও পদ্ধতিগতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ “রেভ্যুলুশন ক্যু” পরিচালনা করে শহরটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সরকারহীন, আইনহীন ও ভয়ের শাসনে পরিণত করে। তার শহর দখলের কৌশলগুলো ছিল- সাংগঠনিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দুর্বল করে প্রশাসনের পতন ঘটানো, সামাজিক শৃঙ্খলা ধ্বংস করে ‘নৈরাজ্যিক’ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, ভুয়া বিপ্লবের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করা এবং আতঙ্ক ও নিপীড়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালি করা। এই কৌশলের আসল উদ্দেশ্যই ছিল ব্যাটম্যানের মানসিক ও শারিরীক পতন ঘটানো এবং গোটা শহরকে ধ্বংস করা। অর্থাৎ বিপ্লবের মুখোশ পড়ে ভয়, নিপীড়ন এবং দখলের রাজনীতি।

আগেই বলেছিলাম, চলচিত্র ও রাজনীতির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। এই কাহিনীর সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে আমরা খুব সহজেই কিছু রাজনৈতিক উত্তর খুজে পাব। দীর্ঘদিনের শাসক যখন কোনো চক্রে আটকা পড়ে যায় তখন সরকারকে বাধ্য করা হয় আইনবিরোধী কাজ করতে, সাইকোলজিক্যাল অপারেশনের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে সরকারকে প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলা হয়। সন্ত্রাস দমনে শাসক তখন পুলিশকে সামরিকীকরনের মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধি করে দমনমূলক আইন ও ধরপাকড় বাড়ায় ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন বাড়তে থাকে। সরকারের চরিত্র হয়ে যায় একনায়কের মত যাকে বলা হয় ‘ব্রুটালাইজেশন অব গভর্নমেন্ট’। ফলে অসন্তোষ বাড়ে। তরুনেরা, যারা নিয়ম-কানুন ও নিয়ন্ত্রন পছন্দ করে না, তারা সরকার বিরোধী হয়ে যায়। ধর্ম ও ঘৃণাকে ব্যবহার করে এই জনরোষ আরও দ্বিগুন করা হয়। যার ফলাফল আমরা দেখেছি ২৪ এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে। যে স্বপ্ন ও আকাঙ্খার জন্ম দিয়েছিল আরব বসন্তের ঢেউ বয়ে যাওয়া এ বঙ্গে, সেই উন্মাদনা যেন নিমিষেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। পুলিশ বাহিনিকে দুর্বল করে পুরো আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা আজ কার্যত অকার্যকর। সরকার প্রশাসন ও সিভিল সার্ভিসের অভ্যন্তরে নতুন বিশ্বস্ত কাঠামো তৈরি করে অভিজ্ঞ আমলার জায়গায় নির্ভরযোগ্য এবং একনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগ করেছে। ফলাফল, রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারন ও প্রাশাসনিক স্বচ্ছতা কমে আসছে যা পরিনত হয়েছে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা নির্ভর যন্ত্রে, যেখানে প্রশ্ন ও সমালোচনা নিষিদ্ধ। ২০২৪ এর অভ্যুত্থানের পরপরই দেখা গেছে বিপ্লবীদের মিডিয়া দখলের সংস্কৃতি, ঘরে ঘরে মামলার ফেরিওয়ালা হয়ে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার, মবের মাধ্যমে ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করে বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনসম্মুখে চরিত্রহনন।

২০২৪ এর আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যহীন একটা সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেইক্ষেত্রে তারা জনমতও যথেষ্ট তৈরি করতে পেরেছিল যার অধিকাংশই ছিল ছাত্রসমাজ। প্রকৃতপক্ষে, জনমত তৈরি হয়েছিল কৌশলে, নির্দিষ্ট একটি শ্রেনীকে টার্গেট করে। ছাত্রসমাজকে বৈষম্যহীন সমাজ ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়ে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে। অর্থাৎ জনগনের নামে ক্ষমতা দখল কিন্তু চর্চা জনগন ছাড়া। রাজনীতির ভাষায় একে বলে ‘পপুলিস্ট ম্যানুপুলেশন’,যেখানে জনগনের মুক্তি নয়, নির্বাক সমর্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একটি শ্রেনী বিপ্লবের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে টার্গেট করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ধাবিত করা হচ্ছে ধর্মান্ধতার দিকে। আজ বিপ্লবীরা “দোসর” ট্যাগ ব্যবহার করে বাগিয়ে নিচ্ছে আর্থিক পুরস্কার। ঘরে ঘরে মামলার সেবা দিয়ে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মকে, শক্তিশালি করার চেষ্টা করা হচ্ছে এক পুরনো পরাজিত শক্তিকে।

ব্যাটম্যান সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- শাসনের সবচেয়ে ভয়ংকর রুপ ‘মুক্তির নামে মানুষকে বন্দী করা’। সিনেমাটি কাল্পনিক হলেও তার কৌশলগুলো আজকের বিশ্বের অনেক বাস্তব রাজনীতিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন শাসন যদি জনগনের মঙ্গলের জন্য না হয়ে তাদের নিয়ন্ত্রনের জন্য চলে, তবে তা বিপদ সংকেত। সিনেমার শেষ দৃশ্যে যেমন ব্যাটম্যান ফিরে এসে তার শহরকে মুক্ত করে, তেমনি বাস্তবেও দরকার জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও অংশগ্রহনমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারন- “শাসন তখনই কল্যাণকর হয় , যখন তা শাসনের জন্য নয়- পরিষেবার জন্য হয়”।