স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দিল্লীতে রয়েছেন। দেশে ফিরলে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না এর নিশ্চয়তা চায় যুক্তরাজ্যের ছয়জন রাজনীতিবিদ। এ বিষয়ে তারা যুক্তরাজ্য সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ চেয়েছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডকে দেওয়া এক চিঠিতে তারা এই দাবি জানায়। পাশাপাশি শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে একই চিঠিতে।
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিষয়ক অনলাইন মাধ্যম ‘কমেন্ট সেন্ট্রাল’ এই চিঠির বিষয়টি প্রকাশ করে। গত ৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই উদ্যোগের কথা জানান দেশটির কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান।
চিঠিতে স্বাক্ষর করা ছয় রাজনীতিক হলেন বব ব্ল্যাকম্যান, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য চার্লস ট্যানক, মার্টিন ডে, পল ম্যাকলেনান, অ্যালান ব্রাউন ও সীমাস লোগান।
চার দাবি জানিয়ে চিঠি:
ছয়জন রাজনীতিবিদের পাঠানো চিঠিতে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে চারটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রথমত, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না—বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তা আদায় করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে ফেরার পর তাকে নির্যাতন, গুম কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হওয়া থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনাকে নিজের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় ও সাজা চ্যালেঞ্জ করার আইনি সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আটক করা হলে সেই প্রক্রিয়াও স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন এই রাজনীতিকরা।
তৃতীয়ত, হাসিনার বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা অনিয়ম হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে (ওএইচসিএইচআর) যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের জন্য যুক্তরাজ্যকে কূটনৈতিক সহায়তা দিতে বলা হয়েছে।
তবে চিঠিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে কোনো ধরনের দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন না তারা। হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার নেতাদের স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা এবং সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত জবাবও চেয়েছেন রাজনীতিকেরা। পাশাপাশি ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনকে বাংলাদেশের সরকার, অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক মিশন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কূটনৈতিক তৎপরতা
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে রেখে আওয়ামী লীগও যুক্তরাজ্যের রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
গত ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ নেতা হাবিব মিল্লাত ছয় ব্রিটিশ রাজনীতিকের স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান। ২০২৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে; এমন আশঙ্কার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছ থেকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। গত ৫ নভেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, হাসিনাকে ফেরাতে কোনো পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথির প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

