গুগলের বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ব্যবহারকারীদের স্বেচ্ছাসেবী সহায়তা প্রদানকারী প্রোডাক্ট এক্সপার্টদের নিয়ে আয়োজিত গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট সামিট ২০২৬-এর এশিয়া-প্যাসিফিক আঞ্চলিক আয়োজনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে পুরস্কার অর্জন করেছেন গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট অ্যাম্বাসেডর মাহাবুব হাসান।
জাপানের টোকিওতে অবস্থিত গুগল জাপান কার্যালয়ে গত ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। সামিটের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে প্রোডাক্ট এক্সপার্টদের বিভিন্ন ধরনের অবদানের স্বীকৃতি দিতে মোট ১১টি বিভাগে পুরস্কার প্রদান করা হয়। মাহাবুব হাসান ‘সোশ্যাল হেল্প’ বিভাগে এবারের পুরস্কার অর্জন করেন।
বাংলাদেশের কোনো প্রোডাক্ট এক্সপার্টের জন্য এটিই গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট প্ল্যাটফর্মে প্রথম অ্যাওয়ার্ড অর্জন বলে জানিয়েছেন মাহাবুব হাসান। তাঁর এই অর্জনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক গুগল স্বেচ্ছাসেবী কমিউনিটির পুরস্কারের তালিকায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নাম যুক্ত হলো।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রোডাক্ট এক্সপার্টদের নিয়ে টোকিও সামিট
গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট সামিট মূলত গুগলের বিভিন্ন সহায়তা ফোরাম ও কমিউনিটিতে দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা অভিজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ সম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত প্রোডাক্ট এক্সপার্টরা এতে অংশ নেন।
২০২৬ সালে তিনটি আঞ্চলিক পর্যায়ে এই সামিট আয়োজন করা হচ্ছে। প্রথম আঞ্চলিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে মেক্সিকোতে। দ্বিতীয় আঞ্চলিক আয়োজনটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রোডাক্ট এক্সপার্টদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় জাপানের টোকিওতে। পরবর্তী আয়োজনটি ইউরোপ অঞ্চলের প্রোডাক্ট এক্সপার্টদের নিয়ে স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এবারের টোকিও আয়োজন ছিল ২০২৬ সালের সামিটগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে প্রোডাক্ট এক্সপার্টদের সঙ্গে গুগলের বিভিন্ন পণ্য ও কমিউনিটি-সংশ্লিষ্ট দলের যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
গুগল একাউন্ট , গুগল ম্যাপস, ইউটিউব, গুগল ফটোস, জেমিনি , গুগল ওয়ান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন গুগল পণ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নীতিমালা, নতুন সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা ও বিভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
কী এই গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট প্ল্যাটফর্ম?
গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট হলো গুগলের বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহারকারীদের সহায়তা করার জন্য গড়ে ওঠা একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী কমিউনিটি। এই প্ল্যাটফর্মের সদস্যরা গুগলের কর্মী নন। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ব্যবহার করে গুগলের বিভিন্ন সহায়তা ফোরামে সাধারণ ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং কারিগরি সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা করেন।
এই কার্যক্রমের শিকড় প্রায় দুই দশক আগের। শুরুতে গুগলের এই স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচির শীর্ষস্থানীয় সদস্যরা ‘টপ কন্ট্রিবিউটর’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে গুগল এই কর্মসূচিকে নতুনভাবে সাজিয়ে ‘গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট’ নামে পরিচিত করে।
বর্তমানে গুগলের বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী এই প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। মাহাবুব হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্রোঞ্জ, সিলভার, গোল্ড, প্লাটিনাম ও ডায়মন্ড—বিভিন্ন স্তরে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি সক্রিয় প্রোডাক্ট এক্সপার্ট এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
তাঁরা ২০টিরও বেশি ভাষায় গুগল সার্চ, গুগল ম্যাপস, ইউটিউব, জিমেইলসহ ৫০টিরও বেশি গুগল পণ্য নিয়ে ব্যবহারকারীদের সহায়তা করছেন।
গুগলের বিভিন্ন সহায়তা ফোরামে এসব স্বেচ্ছাসেবীর অবদান প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবহারকারীদের প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মাহাবুব হাসানের ১৫ বছরের গুগল-যাত্রা
গুগলের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও কমিউনিটির সঙ্গে মাহাবুব হাসানের সম্পৃক্ততা প্রায় ১৫ বছরের। তাঁর স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের শুরু ২০১১ সালে গুগল ম্যাপ মেকার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। ম্যাপ মেকার চালু থাকার সময় তিনি বাংলাদেশে এর আঞ্চলিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রিজিওনাল লিড হিসেবে ।
পরবর্তীতে তিনি গুগল ডেভেলপার গ্রুপ ঢাকার কমিউনিটি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত । ২০১৪ সালে বাংলাদেশ লোকাল গাইডস কমিউনিটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
২০১৬ সাল থেকে তিনি গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। সে সময় প্ল্যাটফর্মটি ‘টপ কন্ট্রিবিউটর’ নামে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইউটিউব, গুগল ড্রাইভ ও গুগল অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন গুগল সেবার সহায়তা ফোরামে ব্যবহারকারীদের কারিগরি সমস্যার সমাধানে অবদান রেখে আসছেন।
এই দীর্ঘ অবদানের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে প্রোডাক্ট এক্সপার্ট স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
বাংলাদেশের জন্য প্রথম প্রোডাক্ট এক্সপার্ট অ্যাম্বাসেডর
মাহাবুব হাসানের দীর্ঘদিনের কমিউনিটি কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি আসে ২০২৫ সালে। সে বছর তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট অ্যাম্বাসেডর নির্বাচিত হন।
২০২৬ সালেও তিনি পুনরায় বাংলাদেশের প্রোডাক্ট এক্সপার্ট অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নির্বাচিত হন।
অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিনি বাংলাদেশে প্রোডাক্ট এক্সপার্টদের কার্যক্রম, নতুন স্বেচ্ছাসেবীদের উৎসাহিত করা এবং গুগল কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সামিটে ১০ বার অংশগ্রহণ
গুগলের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামিট ও কমিউনিটি আয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে অংশগ্রহণ করে আসছেন মাহাবুব হাসান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ১০ বার গুগলের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামিট ও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি।
গুগলেরহেড কোয়ার্টার মাউন্টেন ভিউ , লন্ডন, বেঙ্গালুরু , টোকিওসহ বিভিন্ন স্থানে আন্তর্জাতিক আয়োজনে তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে। ২০২৬ সালের টোকিও সামিট তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কমিউনিটি যাত্রার সর্বশেষ সংযোজন।
লোকাল গাইডস থেকেও একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
গুগলের লোকাল গাইডস প্ল্যাটফর্মেও দীর্ঘদিনের অবদান রয়েছে মাহাবুব হাসানের। ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনি লোকাল গাইডস প্ল্যাটফর্ম থেকে বিভিন্ন বিভাগে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন।
এরপর ২০২০ সালে তিনি ‘গাইডিং স্টার’ এবং ২০২১ সালে ‘মিটআপ চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালে তিনি ‘অ্যাক্সেসিবিলিটি চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবেও স্বীকৃতি পান।
বাংলাদেশে লোকাল গাইডস কমিউনিটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ লোকাল গাইডসের প্রতিষ্ঠাতা মডারেটর হিসেবে তিনি কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
দীর্ঘ স্বেচ্ছাসেবী কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
টোকিওতে এবারের ‘সোশ্যাল হেল্প’ বিভাগে পুরস্কার অর্জন মাহাবুব হাসানের দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে সামনে এসেছে।
গুগলের বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহারকারীদের সমস্যার সমাধান, প্রযুক্তিগত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, নতুন স্বেচ্ছাসেবীদের উৎসাহিত করা এবং বাংলাদেশি কমিউনিটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত।
প্রায় ১৫ বছর ধরে গুগলের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার পর এবার গুগল প্রোডাক্ট এক্সপার্ট সামিটের মঞ্চে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের এই প্রযুক্তি স্বেচ্ছাসেবী।

