ফ্যাবরি ডিজিজ একটি বিরল এবং বংশগত লাইসোজোমাল স্টোরেজ ডিসঅর্ডার, যা মূলত শরীরের কোষে নির্দিষ্ট এক ধরনের চর্বিযুক্ত পদার্থ জমে থাকার কারণে ঘটে। এই রোগের কারণ হলো α-galactosidase A (Alpha-Gal A) নামের একটি এনজাইমের ঘাটতি। এই এনজাইমের অভাবে শরীরে Gb3 (Globotriaosylceramide) নামে এক ধরনের ফ্যাট সঠিকভাবে ভাঙতে পারে না। ফলে তা কোষে জমা হয়ে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের ক্ষতি করে।
ফ্যাবরি ডিজিজ মূলত X-chromosome এর মাধ্যমে বংশগতভাবে ছড়ায়। যেহেতু পুরুষদের একটি মাত্র X ক্রোমোজোম থাকে, তাই পুরুষদের মধ্যে রোগটি গুরুতরভাবে প্রকাশ পায়। মহিলাদের দুইটি X ক্রোমোজোম থাকায় একজন রোগগ্রস্ত হলে অন্যটি কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে রোগের উপসর্গ তুলনামূলকভাবে কমাতে পারে, যদিও অনেক সময় নারীরাও গুরুতর উপসর্গ অনুভব করতে পারেন।
এই রোগের উপসর্গ সাধারণত শৈশব কিংবা কৈশোরে শুরু হয়। প্রথমদিকে অনেকেই বুঝতে পারেন না। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হাত-পায়ে জ্বালাপোড়া অনুভূতি, বিশেষত গরম আবহাওয়ায় বা শারীরিক পরিশ্রমের পর। ত্বকে ছোট লাল বা বেগুনি বর্ণের চিহ্ন (angiokeratomas) দেখা যায়, যা ফ্যাবরি ডিজিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল সাইন। এছাড়া শরীরে ঘাম কমে যাওয়া, তীব্র ক্লান্তি, পেটে ব্যথা, বমি ভাব এবং হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগটি কিডনি, হৃদযন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রে জটিলতা তৈরি করে। কিডনিতে মারাত্মক ক্ষতি হলে ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। হৃদযন্ত্রে অনিয়মিত ছন্দ, হৃদপেশীর ঘন হয়ে যাওয়া এবং হার্ট ফেলিউর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মস্তিষ্কের রক্তনালিতে প্রভাব ফেললে স্ট্রোকের সম্ভাবনাও বাড়ে।
ফ্যাবরি ডিজিজ নির্ণয়ের জন্য রক্তের এনজাইম লেভেল পরীক্ষা এবং জিনগত পরীক্ষা করা হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে Alpha-Gal A এনজাইমের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম পাওয়া যায়। নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় জিনগত পরীক্ষা বেশি কার্যকর হয়, কারণ এনজাইম লেভেল সবসময় কম নাও থাকতে পারে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো Enzyme Replacement Therapy (ERT)। এই থেরাপির মাধ্যমে রোগীর শরীরে অভাব পূরণের লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে কৃত্রিম এনজাইম প্রবেশ করানো হয়। এতে শরীরে জমে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ কমে এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গের ক্ষতি ধীরগতিতে বাড়ে। এছাড়া উপসর্গ অনুযায়ী ব্যথানাশক, হৃদরোগের ওষুধ, ডায়ালাইসিস ইত্যাদিও প্রয়োজন হতে পারে। নতুন কিছু চিকিৎসা যেমন চ্যাপারন থেরাপি এবং জিন থেরাপি নিয়েও গবেষণা চলছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত হলে জটিলতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই অল্প বয়সে বারবার অজানা ব্যথা, ত্বকের অস্বাভাবিক দাগ, কিডনির সমস্যা বা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, ফ্যাবরি ডিজিজ বিরল হলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল। সচেতনতা, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং নিয়মিত চিকিৎসা এই রোগীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। সমাজ ও পরিবার উভয়ের সহযোগিতায় ফ্যাবরি ডিজিজ আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
নাম: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
ইউএমসি ০৭
সেশন: ২০২০-২১
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ
আরোও পড়ুনঃ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে অস্ত্রসহ যুবক গ্রেপ্তার

