সমৃদ্ধ কেরানীগঞ্জের পথে বড় বাধা আর্থিক অজ্ঞতা

Uncategorized আমার ইউনিয়ন সম্পাদকীয় সারাদেশ

আর্থিক সাক্ষরতা শুধু টাকা ব্যবস্থাপনার জ্ঞান নয়, এটি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, কেরানীগঞ্জের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সঞ্চয়, ঋণ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল লেনদেন এবং আর্থিক প্রতারণা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। এর ফলে ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে যেমন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি পিছিয়ে পড়ছে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতি।

কেরানীগঞ্জ ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র শিল্প, পোশাক উৎপাদন, পরিবহন এবং আবাসন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়। কিন্তু এত বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছেন। কেউ নগদ টাকা ঘরে রাখছেন, কেউ পরিচিত ব্যক্তির হাতে জমা দিচ্ছেন, আবার কেউ নামসর্বস্ব সমিতি, অনিবন্ধিত এনজিও কিংবা অস্বচ্ছ সঞ্চয় প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করছেন।

এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো আর্থিক সাক্ষরতার অভাব।

অনেক মানুষের ধারণা, ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ নয় অথবা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গেলে নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে হয়। আবার কেউ মনে করেন, ব্যাংক হিসাব খুলতে অনেক টাকা প্রয়োজন কিংবা ব্যাংক শুধু ধনী ও বড় ব্যবসায়ীদের জন্য। এসব ধারণার অধিকাংশই অসম্পূর্ণ তথ্য, গুজব এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান না থাকার ফল।

অন্যদিকে, প্রতারক চক্র মানুষের এই অজ্ঞতা ও অবিশ্বাসকে কাজে লাগাচ্ছে। বেশি মুনাফা, অল্প সময়ে দ্বিগুণ টাকা, সহজ ঋণ কিংবা মাসিক লাভ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সমিতি ও প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করছে। প্রথম দিকে কয়েক মাস লাভ দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা হয়। পরে একসময় অফিস বন্ধ হয়ে যায়, কর্মকর্তারা পালিয়ে যান এবং সাধারণ মানুষের বছরের পর বছর ধরে জমানো অর্থ হারিয়ে যায়।

আর্থিক সাক্ষরতা থাকলে একজন মানুষ অন্তত কিছু মৌলিক প্রশ্ন করতে শিখতেন। প্রতিষ্ঠানটি কি সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত? টাকা জমা দেওয়ার বৈধ রসিদ আছে কি? অস্বাভাবিক বেশি মুনাফা দেওয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তি কী? কোনো সমস্যা হলে অভিযোগ কোথায় করা যাবে? এসব প্রশ্ন না করেই শুধু পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিবেশীর কথায় টাকা বিনিয়োগ করার কারণে বহু পরিবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।

আর্থিক অজ্ঞতার আরেকটি বড় প্রভাব দেখা যায় ঋণ ব্যবস্থাপনায়। অনেক মানুষ ঋণের সুদের হার, কিস্তির সময়সূচি, বিলম্ব ফি এবং মোট কত টাকা ফেরত দিতে হবে, তা ভালোভাবে না বুঝেই ঋণ গ্রহণ করেন। কেউ একটি ঋণ পরিশোধ করতে আরেকটি ঋণ নেন। ফলে ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সংসারের ব্যয়, সন্তানের পড়াশোনা এবং চিকিৎসার খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

একইভাবে নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার সামান্য জরুরি পরিস্থিতিতেই আর্থিক সংকটে পড়ে। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, ব্যবসায় লোকসান কিংবা চাকরি চলে যাওয়ার মতো ঘটনায় তাদের ধার করতে হয় অথবা সম্পদ বিক্রি করতে হয়। অথচ অল্প আয় থেকেও নিয়মিত ছোট একটি অংশ সঞ্চয় করা গেলে ধীরে ধীরে জরুরি তহবিল তৈরি করা সম্ভব।

নগদবিহীন যুগের জন্য কেরানীগঞ্জ কতটা প্রস্তুত?

বিশ্ব দ্রুত নগদবিহীন বা ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, কিউআর কোড এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে। স্কুল-কলেজের বেতন, ভর্তি ফি, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল, ইন্টারনেট বিল, অনলাইন কেনাকাটা এবং সরকারি বিভিন্ন ফি এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিশোধ করা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, কেরানীগঞ্জের সাধারণ মানুষ কি এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?

অনেক মানুষ মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করলেও নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম জানেন না। অপরিচিত ব্যক্তিকে পিন বলে দেওয়া, ভুয়া ফোনকলের নির্দেশে কোড ডায়াল করা, সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ করা কিংবা যাচাই না করে ভুল নম্বরে টাকা পাঠানোর মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে। প্রতারণার শিকার হওয়ার পর অনেকেই বুঝতে পারেন যে ডিজিটাল লেনদেন শুধু মোবাইল চালাতে জানলেই হয় না, এর জন্য নিরাপত্তা ও আর্থিক সচেতনতাও প্রয়োজন।

আগামী দিনে অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি সেবা ডিজিটাল হয়ে গেলে আর্থিক জ্ঞানহীন মানুষ আরও বেশি সমস্যায় পড়বেন। তারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবেন এবং প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়বে। ডিজিটাল ব্যবস্থাকে ভয় পেয়ে দূরে থাকার সুযোগও থাকবে না। তাই এখন থেকেই মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে।

সমাধান শুরু হোক স্থানীয় পর্যায় থেকে :

কেরানীগঞ্জে আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানোর জন্য শুধু জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণা যথেষ্ট নয়। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মহল্লাভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমত, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত আর্থিক সচেতনতা কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। এসব কর্মশালায় সহজ ভাষায় ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা সঞ্চয়, ঋণ গ্রহণ, কিস্তি হিসাব, ডিজিটাল লেনদেন এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষার নিয়ম শেখাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য মৌলিক আর্থিক শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। কীভাবে ব্যক্তিগত বাজেট তৈরি করতে হয়, আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখতে হয়, প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যে পার্থক্য করতে হয় এবং সঞ্চয় করতে হয়, তা ছোটবেলা থেকেই শেখানো উচিত। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা।

তৃতীয়ত, কেরানীগঞ্জের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার, কারখানার শ্রমিক, পরিবহনকর্মী এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ব্যবসার টাকা ও ব্যক্তিগত খরচ আলাদা রাখা, দৈনিক হিসাব লেখা, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা এবং নিরাপদ ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

চতুর্থত, কোনো সমিতি, এনজিও বা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে টাকা দেওয়ার আগে সেটির অনুমোদন যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন অনুমোদিত ও অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে পারে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পঞ্চমত, ব্যাংকগুলোকেও মানুষের কাছে যেতে হবে। শুধু শাখায় বসে গ্রাহকের অপেক্ষা করলে চলবে না। বাজার, শিল্প এলাকা এবং জনবহুল স্থানে আর্থিক সচেতনতামূলক ক্যাম্প আয়োজন করতে হবে। হিসাব খোলার নিয়ম সহজ করা, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে হাতে-কলমে সহায়তা করা প্রয়োজন।

সবশেষে, পরিবার থেকেই আর্থিক শৃঙ্খলা শুরু করতে হবে। মাসিক আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখা, অপ্রয়োজনীয় ঋণ এড়িয়ে চলা, সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত সঞ্চয় করা এবং পরিবারের নারী সদস্যদের আর্থিক সিদ্ধান্তে যুক্ত করা জরুরি।

আগামীর কেরানীগঞ্জ গড়তে আর্থিকভাবে সচেতন মানুষ প্রয়োজন :-

শুধু নতুন সড়ক, ভবন, বাজার কিংবা শিল্পকারখানা নির্মাণ করলেই একটি এলাকা উন্নত হয় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন মানুষ নিজের আয়, সঞ্চয়, ঋণ এবং বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

কেরানীগঞ্জকে আধুনিক, ডিজিটাল এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এলাকায় পরিণত করতে হলে আর্থিক সাক্ষরতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল করতে হবে, নিরাপদ সঞ্চয়ের পথ দেখাতে হবে, দায়িত্বশীলভাবে ঋণ ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে এবং ডিজিটাল প্রতারণা থেকে বাঁচার কৌশল শেখাতে হবে।

আজ আমরা যদি সাধারণ মানুষের আর্থিক জ্ঞান বাড়াতে না পারি, তাহলে আগামী দিনের সম্পূর্ণ ডিজিটাল অর্থনীতিতে কেরানীগঞ্জের একটি বড় জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়বে। আর যদি এখন থেকেই সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে আর্থিকভাবে সচেতন, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ একটি কেরানীগঞ্জ গড়ে তোলা সম্ভব।

আর্থিক সাক্ষরতা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি বর্তমানের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

 

 

লেখক:

সাইফুল ইসলাম শরীফ
Junior Associate, Institute of Bankers, Bangladesh (IBB)
MBM | MBA